ডায়েরি হলো সবার পার্সোনাল জিনিস যেটা অনুমতি ছাড়া দেখতে নেই

পরদিন ঠিক সকাল বেলা ঘরে বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছিল আশা ঠিক তখনই টেবিলে রাখা ডায়েরিটা চোখে পড়ে৷ ভাবে, অলস সময় কাটানোর চেয়ে ডায়েরিটা খুলে দেখি কি লেখা আছে। যদি এতে একটু সময় কাটে।ডায়েরি হলো সবার পার্সোনাল জিনিস যেটা অনুমতি ছাড়া দেখতে নেই এটা জেনেও কোনকিছুর তোয়াক্কা না করেই আশা ডায়েরিটা খুললো। প্রথম পৃষ্ঠায় খুব সুন্দর হাতের লেখনিতে লেখা.

ভালেবাসা, পৃথিবীর সবচে প্রয়োজনীয় একটা কষ্টের নাম। তবুও পুরো পৃথিবীই এই কষ্টের পেছনেই অন্ধের মতো ছুটে।লেখাগুলো কেমন যেন মলিন হয়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক বছর আগের লেখা অবহেলায় ওইখানটায় পড়ে ছিলে।

তবুও সময় কাটানোর জন্য আশা পরের পৃষ্ঠায় চলে যায় সেখান থেকে লেখা সবার জীবনেই কোনও না কোনও এক সময় ঠিকই ভালোবাসা আসে। আর ভালোবাসাই মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য আত্মার শক্তি যোগায়, হাসতে শেখায়, বাঁচতে শেখায়। সবার জীবনই এই চক্রের মাঝেই আবদ্ধ থাকে তবে শুধু আমিই কি সেই চক্র থেকে বিচ্ছিন্ন?

আমি কখনও মা-বাবার আদর পাইনি! মা- যে কী তা বুঝতেই পারিনি৷ সেই ছোট থেকেই বইয়ের পাতায় পড়েছি পৃথিবীতে সন্তানের সবচে শান্তির নীড় হলো মা। মায়ের চেয়ে বড় পাওয়ার জিনিস আর কিছুই নেই। অথচ আমি জানিই না মা কী। মায়ের আদরটাই বা কী।

শুনেছিলাম আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই আমার মা মারা যান৷ সেই সময়ে আমাদের পরিবারের জন্য বা টাকার অভাবে হোক বা সমাজের নিয়মে হোক সিজারের প্রচলন ছিলো না। জন্মের সময় আমার পা’টা নাকি মায়ের নাড়ীর সাথে পেঁচিয়ে গেছিলো। খুব চেষ্টা করেও সেটা ছাড়ানো যায়নি। ফলস্বরূপ আমি পৃথিবীতে প্রথম নিঃশ্বাস নেয়ার আগেই নাড়ী ছিড়ে মা মারা যান।

পৃথিবীতে কারও জন্ম হওয়া সেই পরিবারের মানুষের জন্য সবচে খুশির দিন। অথচ আমি হলাম তার বিপরীতে। আমি এলাম সবাইকে কাঁদাতে। আমি এলাম আমার সবচে আদরের জায়গাটাকে বিদায় দিয়ে। মা মারা যাওয়ার পর আমাকে লালন-পালন করার জন্য নানী আমাকে তার কাছে নিয়ে যান। হয়তো সেখানে মা’হীন আমি ভালোভাবেই লালনপালন হচ্ছিলাম।

শুনেছিলাম আমার বয়স ছ’মাস হতে না হতেই বাবা আরেকটা বিয়ে করেন। আর ঠিক করা হয় আমি বুঝদার হলেই বাবার কাছে থাকবো আমার যখন থেকে মনে পড়ে তখনের কথাই বলি। আমার নানু মারা গিয়েছিলেন অনেক আগে। তাই নানী আমাকে খুব আদর করতেন। তিনি আমার মাঝেই নানাকে হয়তো খুঁজতেন। চোটবেলায় দেখতাম মামাতো ভাই-বোনেরা একজনকে মা বলে ডাকতো।

মা ডাকা মানুষটা ওদের খুব আদর করতো, হাতে তুলে খাওয়াতো, কোলে ঘুম পাড়াতো। আমিও খুঁজতাম মা’কে। কিন্তু খুঁজে পেতাম না আবার নানীকে বললেও খুঁজে দিতো না। তবে নানী আমার খুব ভালোবাসতো আমাকে৷ খুব ছোট থাকলেও সেদিনের কথা মনে আছে আমার। সারাদিন ঠিকঠাক মানুষটা হঠাৎই অসুস্থ হয়ে যায়। তখন প্রায় সন্ধ্যা। আমি নানীর কাছেই বসে ছিলাম৷

কি যে হলো তার, শুধু আমাকে বললো মামাদের ডাকতে তার নাকি কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। আমি দৌড়ে সবাইকে ডেকে আনলাম। এরপর কি হলো ভীড়ের মাঝে আর কিছুই বুঝলাম না৷ শুধু মামীদের কান্নার আওয়াজই আমার কানে ভাসছিলো।

আমি এককোণে চুপচাপ বসে ছিলাম। দেখলাম নানী একদম চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে। তখনও আমি মরে যাওয়ার আসল মানেটা বুঝিনি। শুধু বুঝতাম যে, মরে গেলে মাটির কবরে তাকে রেখে আসা হয়। খুব তাড়াতাড়িই সব কেমন যেন শেষ হয়ে এলো। আদরের জায়গাটাও আমার ফুরিয়ে গেলো৷ নানীকে খুঁজলেও আর পেতাম না। তবে মাঝে মাঝেই আমার মনে হতো তিনি আমার কাথায় হাত রেখে বসে আছেন।

নানী মরার পরপরই আমাকে নিয়ে ঝগড়া শুরু হলো মামাদের মাঝে। তারা কেউই চান না যে আমি তাদের সংসারের কেউ হয়ে থাকি। হঠাৎই এতদিনের মায়ার বাঁধন ছেড়ে অপরিচিত একজন এসে এক অপরিচিত জায়গায় আমাকে নিয়ে গেলো। জানলাম তিনি আমার বাবা।

তখনও কিছু বুঝতাম না৷ তবে সেখানেও যে আমাকে নিয়ে অনেক কথাই চলতো সেটা একটু আধটু বুঝতাম। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলাম। বাবা হঠাৎই সৎ মা আর তার দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে শহরে চলে গেলো। আমাকে রেখে যাওয়া হলো চাচাদের সংসারে। তখন অনেকটাই বুঝতে শিখেছি। অনেক কিছুই।
কি আজব সম্পর্ক গুলো! বাবা আমার একটুও খোঁজ নিতো না।

হয়তো তিনি আমাকে দূরেই রাখতে চাইতেন। চাচাদের সংসারে আমি ছিলাম বোঝার মতো। রাখতে হয় তাই রাখছেন না হলে ছুঁড়েই ফেলে দিতেন। অনেক কিছু আবদার করতে মন চাইলেই আমি বরাবরই চুপচাপ থাকতাম। চাচাতো ভাইবোনকে যখন নতুন জামাকাপড় কিনে দিতো তখন ভাবতাম আমাকেও দেবে। তবে পেতাম না৷

ওদের চিপস কিনে দিয়ে বলতো ঘরে বসে খা, ওকে দেখাস না কিন্তু । সবই শুনতাম, বুঝতামও তবে না বুঝার ভান করেই চলতে হতো। আমি সব সময়ই ভাবতাম একদিন আমার খুব সুখ হবে সেদিন সবাই ভালেবাসবে। তবে এমন কিছুই হয়নি। তবুও আমি সব সময়ই মুখে হাসি এনেই চলেছি। কষ্ট গুলো যে একান্তই নিজের।

এইচএসসি দেয়ার পর আমাকে বলে দেয়া হয় এবার নিজের মতো করে চলতে। নিজের জীবন নিজের মতো গুছিয়ে নিতে। ততদিনে আমিও বুঝতে শিখে গেছি সব।তারাই বা আর কতদিন দেখবে যেখানে আপন বাবাই কখনও খোঁজ নিলো না সামান্য কিছু টাকা সহ আমাকে সব ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমাতে হয়। সবই কেমন অচেনা। তবুও নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিলাম।

এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে পড়াশোনাটা চালিয়ে গিয়েছিলাম। তারপরই অনেক চেষ্টার চাকরি। আমার খুব ইচ্ছে কেউ একজন আমাকে ভালোবাসুক। আমার মায়ের মতো, নানীর মতো। আমি কখনোই ভালোবাসা কি তা বুঝিনি। আমি চাই কেউ আমায় বুঝিয়ে দিক যে এটাই ভালোবাসা। আমি কখনোই কাঁদিনি।

তবে ইচ্ছে করে খুশিতে কাঁদতে। এতিম হয়েছি এটা কখনোই ভাবি না। আমি যে মানুষ। শুধু ভালেবাসা কি সেটাই বুঝলাম না। মায়ের আদরটাও বুঝলাম না কাঁদতে পারলে হয়তো কষ্ট টা কম হতো তবে আমার যে কান্না পায় না। হাসির আড়ালে কষ্ট গুলো খুবই যন্ত্রণা দেয় হয়তো এটাই ভালোবাসা।

আর কিছু লেখা নেই ডায়েরিতে। ডায়েরিটা পড়ে কেমন যেন লাগছে আশার। ও ভেবেছিলো পৃথিবীতে একমাত্র ওই হয়তো সবচে বেশি দুঃখী। তবে ডায়েরিটা না পড়লে হয়তো জানাই হতো না যে কেউ একজন সেই ছোটবেলা থেকে আজও হাজারো কষ্ট হাসির আড়ালে কি দারুণ ভাবেই না লুকিয়ে রেখেছে।

ছেলেটাকে দেখে কে বলবে যে তার জীবনে কখনও ভালোবাসা আসেনি। এত কষ্টের মাঝেও এত নিখুঁত হাসি সম্ভব চোখটা মুছে ডায়েরিটা আগের জায়গাতেই ভালোভাবে রেখে দিলো আশা। কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে ওর নিজেকেই। ও সব সময়ই ভাবতো পৃথিবীর সব পুরুষই খারাপ, বর্বর। তবে এই ছেলেটা! আশার সারাটা দিন ঘোরের মাঝেই কেটে গেলো। সব কেমন যেন এলোমেলো লাগছে ওর।

রাত প্রায় নয়টা বাজে। কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলে দিলে আশা। প্রতিদিনের মতোই ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে ঘরে ঢুকলো আরাদ। তারপর ব্যাগটা রেখেই প্রতিদিনের মতো রান্না করতে চলে বুক ফেটে কান্না আসে আশার। এত পাষাণ মানুষ! সেই সকাল থেকে রোবটের মতো খাটুনি খেটে বাসায় এসেও শরীরটাকে একটু দম দিতে পারে না।

আর আমি! একজনের অপরাধ সবার উপর চাপিয়ে এ কি করছি সব পুরুষই যে এক না। কেউ বর্বর আবার কেউ খুবই নরম। আরাদ ছেলেটা। ইশ। চোখ দিয়ে পানি বের হয় আশার। ছেলেটা কখনোই মুখ ফুটে একটা কথাও বলেনি। এত কষ্ট বুকে জমিয়ে রেখে কি সুন্দর করে জীবনযাপন করছে তাও আবার হাসিমুখে। একটু ভালোবাসা কি ছেলেটার পাওয়া উচিত না?

কত নীচু আমি। এই মানুষটাকে এতদিন কতই না কষ্ট দিয়েছি ভেবেই চোখ দিয়ে আরও বেশি পানি পড়ে আশার৷ তাড়াতাড়ি চোখটা মুছে রান্না ঘরে চলে যায়৷ দেখে আরাদ পেঁয়াজ কাটছে। আগুনের লাল আলোয় ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে আরও কষ্ট হয় আশার। সরে দাঁড়ান আজ আমি রান্না করি।

পেছন থেকে আশার গলা শুনে চমকে যায় আরাদ। এই প্রথম নিজে থেকে কথা বললো আশা। আরাদ একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো সমস্যা নেই আমার অভ্যাস আছে। আপনি রুমে যান।

আরাদের হাসি দেখে রাগই হলো আশার। তাই খানিকটা ধমক দিয়েই বললো বলেছি না আমার কথা শুনতে। যান তাড়াতাড়ি এখান থেকে। গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে গোসল দিয়ে রেস্ট নিবেন যান আশার দমক শুনে কেমন যেন ভয় ভয়েই আরাদ রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আরাদের ভয়ার্ত মুখটা দেখে মনে মনে হেসেই দিলো আশা।

তবে আরাদের খুব ভালো লাগছে। এতটা ভালো লাগছে যা বলার মতো না৷ আরাদ তো এমন শাসন ই চায়। তবুও হাবিজাবি ভাবতে ভাবতেই রেস্ট নিয়ে গোসলটা সেরে নিলো আরাদ ঘন্টা খানেক পরই আশা পাশের ঘর থেকে বললো  খেতে আসুন তাড়াতাড়ি।

আরাদ যেন এই কথাটার অপেক্ষাতেই ছিলো। তাই তাড়াতাড়ি করে ঘরে গিয়ে চুপচাপ খেতে বসলো। আশা নিজ হাতে আারদকে খেতে দিচ্ছে। আরাদের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এতো ভালোবাসা ও জীবনে কখনও পায়নি। এক লোকমা ভাত মুখে নিতেই টুপ করে একফোঁটা জল ওর গাল বেঁয়ে গড়িয়ে পড়লো।

সেটা নজর এড়ালো না আশারও। অবাক হলো আশা। যে মানুষটা এত কষ্টেও কাঁদে না সেই মানুষটা সামান্য কারণেই কেঁদে দিলো আরাদ চুপচাপ খাওয়া শেষ করলো। সাথে আশাও। খাওয়া শেষে আরাদ ঘুমানোর জন্য বিছানা ঠিক করছে ঠিক তখনই আশা বললো.

সব সময়ই ভাবতাম হয়তো আমিই পৃথিবীর একমাত্র অবহেলিত মানুষ। তবে আপনাকে না দেখলে বুঝতামই না যে কেউ একজন আমার থেকেও বেশি কষ্টে থাকতো। আমি ভাবতাম সব পুরুষই এক রকম তবে ধারণা একদম ভুল। আপনার সাথে খুব বেশিই খারাপ করে ফেলেছি৷

আপনার যেমন ভালোবাসার অভাব আমারও ঠিক তেমনই। আচ্ছা, আমরা কি পআরেকজনকে ভালোবাসা দিয়ে দু’জনের অভাব পূরণ করতে? আমরা কি পারি না একসাথে হাসিখুশি আরাদের মুখ দিয়ে কোনও কথাই বের হচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ওর মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। তবে চোখ দিয়ে জল পড়ছে ওর। আশা বুঝতে পারছে এই জল কষ্টের না।

তবে আরাদের চোখে আর ঘুম আসে না। হঠাৎ করে এত ভালেবাসা পাওয়া, এত সুখ পাওয়া ওর কেমন যেন অসহ্য লাগছে। শুয়ে শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করছে। কিছুতেই ঘুম আসছে না ওর। হঠাৎই আরাদ ওর পাশে কারও উপস্থিতি টের পেলো। বুকটা ধড়ফড় করছে ওর। কেমন যেন মাথাটা ঘুরছে। আরাদ ওর হাতের মাঝে একটা হাতের উপস্থিতি টের পেয়ে কেঁপে উঠলো।

আমাকে মাফ করবেন। এতদিন ভুল বুঝেছি। আপনাকেও কষ্ট দিয়েছি। তবে আজকের পর থেকে আমি আর এমন করবো না। আমাদের সব প্রয়োজন আমরাই মিটিয়ে নেবো। বুঝেছেন আরাদ শুধু মাথাটা আলতো করে “হ্যাঁ” সূচক নাড়ালো। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ওর। আশার চোখেও পানি। আশা ওর দু’হাত দিয়ে আরাদের হাতটা শক্ত করে ধরে বললো চেষ্টা করবো আপনার অপূরণীয় ভালেবাসাগুলো পুরণ করে দিতে। আপনার মায়ের, নানীর আর একজনেরও।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *