আমার আর নিলীমার বিয়ের পর তুমি

আমার আর নিলীমার বিয়ের পর তুমি বিদেশে চলে গেলে। সবাই জানে তুমি লেখাপড়ার জন্য গেছো কিন্তু আমি জানতাম তুমি আমার জন্যই গেছো। নিজের বোনের জন্য তুমি নিজের ভালোবাসাকেই কুরবানী করে দিয়েছিলে। আমি চাইনি তুমার কুরবানী বৃথা যাক, আমি নিলীমাকে কখনো তোমার আমার ব্যাপারটা জানতে দেইনি। নিলীমা আমায় খুব ভালোবাসতো আমি হাশি মুখেই মেনে নিয়েছিলাম তার ভালোবাসা, তাকে আগলে নিয়ে ছিলাম বুকে। নিলীমার ভালোবাসা আমার মনের সব জায়গা গুলো দখল করে নিলো। আবার নতুন করে সপ্ন দেখতে শুরু করলাম, নতুন একটা পৃথিবী সাঁজিয়ে ছিলাম নিলীমার জন্য। কিন্তু কপাল দেখো! ভালোবাসা শইলো না আমার কপালে। বিয়ের তিন মাসের মাথায় একদিন নিলীমা হঠাৎ করে বেহুশ হয়ে পরে গেলো। সবাই অন্য একটা সু-খবরের আশায় খুবই খুশি ছিলো সেদিন। কিন্তু ডাক্তারের কথা সেদিন সবার মুখ থেকে কেড়ে নিয়েছিলো সেই খুশিটা। সে জানালো নিলীমার ব্লাড-ক্যান্সার আর ও এখন শেষ স্টেজে আছে যেখানে ওর বাঁচার আর বিন্দু মাত্রও সুযোগ ছিলো না। দেখতে দেখতেই আমার চোঁখের সামনে থেকেই হাড়িয়ে গেলো নিলীমা। বুক ফেটে যাচ্ছিলো সেদিন কিন্তু কছম করে বলছি এক ফোটা জলও আমার চোঁখ বেয়ে পরে নি। জানি না কেন খুব কাঁদতে চেয়েও পারিনি আমি।(কথাগুলো বলতে কষ্ট হচ্ছিলো রানার। তার চোঁখে পানি আর নীলার ও)
> নিলীমা চলে যাওয়ার পর আমার দুনিয়ায় অন্ধকার ছেয়ে আসলো। ভেঙ্গে পরেছিলাম আমি। রোজ ওর কবরের পাশে চলে যেতাম। আমার মনে হতো ‘এই বুঝি নিলীমা আবার আমায় ডাকলো! এই বুঝি ওর ঘুম ভেঙ্গে গেলো!’ কিন্তু নিলীমা আর ফিরে আসেনি। কিছুটা সময় লেগেছিলো স্বাভাবিক হতে। পাগলামি বন্ধ হলো কিন্তু ওকে ভুলতে পারলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম আর বিয়ে করবো না, নিলীমার স্মৃতি আকড়েই বেঁচে থাকবো। কেঁটে যায় চারটা বছর। এই চারটা বছরও পারে নি আমার মন থেকে নিলীমাকে মুছে ফেলতে। গতকাল বাবা-মা অনেক চাপ দেয়। অনেক বোঝায়, তাদের মড়ামুখ দেখার কথা বলে। একমাত্র তাদের জন্যই এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম। আমি জানতাম না পাত্রী কে! বিয়ের আগে আমি পাত্রীর সাথে একবার কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। আর আজ দেখোনা নিয়তি আজ চারটা বছর পর তোমায় আবার আমার সামনে এনে হাজির করলো। সত্যি জীবনটা অনেকটাই বিচিত্র্যময়।(রানা)
রানার কথা শুনে নিলীমা কিছুই বলতে পারে না। সে এখনো ঠিক বুঝতে পারেনি এখানে কি হচ্ছে তবে তার কাছে একটা কথা ক্লিয়ার আর তা হলো নিলীমা আর নেই কিন্তু এ কথা কেন তাকে জানানো হলো না। শেষ বারের মতো কি সে কি তার বোনটাকে দেখতে পারতো না!
কেন তার মা-বাবা তার সাথে এমনটা করলো। এর একমাত্র উত্তর তাদের কাছেই আছে।..(ভাবতে থাকে নীলা)
> তুমি চিন্তা করো না! খুব তারাতারি তোমায় মুক্তি দিয়ে দিবো। তুমি খাটে শুয়ে পরো আমি ফ্লোরে শুচ্ছি।(রানা)
রানার ঘরে একটাই খাট। এক্সট্রা কোনো কাথাও নেই তার ঘরে তাই সে খালি মেঝেতেই শুয়ে পরে। নীলা খাটে গিয়ে শুয়ে পরে। সে রানার দিকেই তাকিয়ে থাকে।
“কতটা পালটে গেছে ও! কতটা বুঝতে শিখেছে! কতটা দুষ্টু ছিলো আজ কতটা গম্ভীর ও! জীবনটা কিভাবে সব কিছুই পালটে দিলো! এমনটা না হলেও পারতো।”
রানার দিকে তাকিয়েই ভাবতে থাকে নীলা।
এদিকে শুধু মেঝেতে শুতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো রানার।
> উপরে উঠে এসো।(নীলা)
> না আমি এখানেই ঠিক আছি।
> আসতে বলছি না!!(একটু ধমকের স্বড়ে নীলা)
এবার রানা গিয়ে নীলার পাশে বিছানায় শুয়ে পরে। শাড়াদিনের ধকলের ফলে দুজনই ক্লান্ত ছিলো তাই তারা ঘুমিয়ে পরলো।
সকালে রানা ঘুম থেকে উঠে দেখে তার টেবিলের পাশে চা রাখা..
> নিলীমা.. ও নিলীমা…
নীলা রুমে চলে আসলো। নীলাকে দেখে রানার মনে পরলো তার অতীতের কথা।
> কি হয়েছে! নিলীমার কথা খুব মনে পরছে?(নীলা)
> আসলে নিলীমা রোজ সকালে আমার জন্য টেবিলে চা রেখে দিতো। আজ হঠাৎ করেই চায়ের কাপটা দেখে….
রানা আর কিছু বলতে পারে না…
> চা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। নাস্তা করে আমাদের বাড়ী যেতে হবে।(নীলা)
রানা চা খেয়ে লাগলো। নীলা আবার নিচে চলে গেলো।
রানা চা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে চলে গেলো নাস্তা করতে। সকালের খাওয়া শেষে নীলাকে নিয়ে রওয়ানা দিতে হলো নীলাদের বাড়ীর উদ্দেশ্যে।
নীলাদের বাড়ী পৌছাতেই রানা চলে গেলো নিলীমার রুমটাতে।
দেওয়ানে অনেক খুলো ছবি লাগানো। ঠোটে ছোট্ট হাশি পাগলিটাকে খুব সুন্দর লাগে হাসলে ছবি গুলো রানার মনে যেন ক্ষত এঁকে দিচ্ছে।
তারপর ফ্রশ হয়ে চিতে চলে গেলো রানা। সবার সাথে কিছুখন কথা বলে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে আসলো আবার নিলীমার রুমটাতে।
দুপুরে ঘুমিয়ে পরলো রানা আর অপর দিকে নীলা চলে গেলো তার মা-বাবার কাছে তার না জানা প্রশ্নগুলোর উত্তর খুজতে….
> মা.! বাবা.! তোমরা এমনটা কেন করলে আমার সাথে? নিলীমা কে আমি শেষ বারের মতো দেখতে পারলাম না। দেখতে পারলাম না আমার বোনটাকে। কেন করলে এমন ?(নীলা)
> নিলীমা না করেছিলো মা। ও আমাদের তোর আর রানার ব্যাপারে সব বলেছিলো মৃত্যুর আগে। নিলীমা আমাদের কাছে মৃত্যুর আগে শেষ কি আবদার রেখেছিলো জানিস! আমরা যেন তোর পড়ালেখা শেষ হলে রানা হতে তুলে দেই। আর এই কথা তোকে আর রানাকে বলতে না করেছিলো। আর আমাদের এ চিঠিটা দিয়ে বলেছিলো তোদের বিয়ের পর তোকে দিতে।(মা)
নীলা টান দিয়ে চিঠিটা নিয়ে নিলো। তারপর সে তার রুমে চলে গেলো…
“ক্ষমা করে দিস বোন,
আমি খুব শ্বার্থপর রে। খুবই শ্বার্থপর। অনেক বড় অন্যায় করেছি তোর সাথে।
জানিস রানা যখন প্রথম কলেজে এসেছিলো ওকে খুব পছন্দ হয়েছিলো আমার। ওর কাছে থাকতে চাইছিলাম আমি। ভিতরে ভিতরে ভালোবেসে ছিলাম ওকে। ওর দুষ্টুমিগুলো খুব ভালো লাগতো আমার। আমি ওর দুষ্টুমির প্রেমে পরে যাই। হঠাৎ যখন রানা নিখোজ হয়ে যায় আমার দুনিয়াটাই উল্টে গিয়েছিলো। আমি পাগল হয়ে গেছিলাম। আমি বুঝে গেছিলাম ওকে ছাড়া থাকা আমার পক্ষে সম্ভাব হবে না। আমি এই কথাটা বলতে তোর রুমে যাচ্ছিলাম তখনি তোর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। তুঈ প্রলব বকছিলি রানাকে নিয়ে। তখন জানতে পারি তুই রানাকে ভালোবাসিস আর রানাও তোকে ভালোবাসে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরেছিলো। আমি কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। যাকে দু-দিন না দেখে এ অবস্থা তাকে শাড়া জীবনের জন্য কি করে হাড়িয়ে ফেলি! হ্যা স্বর্থপর হয়ে গিয়েছিলাম এক মুঠো ভালোবাসা পাওয়ার আশায়। ছিনীয়ে নিয়েছিলাম তোর কাছ থেকে রানাকে কিন্তু তুই মুখ বুজে সহ্য করেগেলি। কোনোই প্রতিবাদ করলি না। খুব অপরাদবোধ হচ্ছিলো কিন্তু আমি এতোটাই স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম যে সেদিন তোর ত্যাগ আমার চোঁখে পরে নি। রানার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায় আমি যেন আকাশের চাঁদ পেয়ে গিয়েছিলাম হাতের মুঠোয়। আমার খুশি দেখে কে!
কিন্ত কপাল দেখ! বিয়ের দু-দিন আগে আমার এক বান্ধবীর আত্মীয়কে রক্ত দিতে গিয়ে জানলাম আমার রক্ত নষ্ট হয়ে গেছে অর্থাৎ আমার ক্যান্সার যা অনেক আগে থেকেই লুকিয়ে আছে আমার শরীরে । অনেক চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ডাক্তার বললো এখন আর কিছুই করার নেই। আমার আয়ু আর মাত্র ২-৩মাস। আমার সব সপ্নগুলো মূহুর্তেই ভেঙ্গে গেলো। একবার ভাবলাম বিয়েটা ভেঙ্গে দেই কিন্তু ভালো থাকার লোভটা সামলাতে পারলাম না। কাউকেই জানালাম না বিষয় টা।
বিয়ে হয়ে গেলো রানার সাথে। আমাদের বিয়ের পর তুই বাইরে চলে গেলি। আমি জানতাম তোর চলে যাওয়ার কারণ তবুও চুপ ছিলাম সেদিন। রানার সাথে ভালোই চললো আমার ভালোবাসার সংসার। ও আমায় ভালোবাসতে শুরু করলো। ওখন রানা আমায় খুব ভালোবাসে কিন্তু আমার কাছে সময় নেই।
হসপিটালের বেডে শুয়ে শেষ সেকেন্ডগুলো গুনছি। আমি চলে যাচ্ছি বোন। অপরাধবোধের কারনে আমার এই মুখটা তোকে দেখাতে পারবো না। তাই তোকে খবর দিতে দিলাম না।
জানিস আমার এই শেষ সময় তোকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছে কিন্তু সব ইচ্ছাগুলো কি আর সত্যি হয় বোন। আমার সপ্নগুলো পূরন হোলো না কিন্তু আমি তোর সপ্নগুলো ভেঙ্গে দিয়েছি।
বোন বিশ্বাস কর এক মুঠো ভালোবাসার আশায় আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। শেষ করে দিলাম তোর সপ্নগুলো তাই চেষ্টা করলাম তোর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জিনি গুলো আজ আবার তোকে ফিড়িয়ে দেওয়ার। জানি আমি তোকে হাড়িয়ে যাওয়া সময়গুলো ফিড়িয়ে দিতে পারবো না। আমায় মাফ করে দিস তার জন্য।
আজ যখন আমার এই চিঠিটি তোর হাতে তারমানে তুই এতোখনে তোর ভালোবাসার মানুষটাকে পেয়ে গেছিস।
একটা শেষ অনুরোধ করবো বোন!
এই চিঠিটা পরে পুড়িয়ে ফেলিস। রানাকে এসব কিছুই বলিস না। ও আমায় অনেক ভালোবাসে। হয়তো এগুলো জানলে আমায় খুব ঘৃণা করবে! দয়াকর বোন আমি ওর মনেই অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চাই।
ক্ষমা করে দিস বোন…
তোর স্বার্থপর বোন
নিলীমা ”
চিঠিটা পরতে পরতে চোখে পানি চলে আসে নীলার।
সে চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলে। বিকেলে চলে যায় নিলীমার কবরের পাশে…
> বোন তুই একদমই স্বার্থপর না। তুই খুব ভালো। তুই আমার বোন। এই এতিমটার একমাত্র বোন। চিন্তা করিস না বোন রানার মনে সর্বদাই তোর জায়গাটা থাকবে। আমি কখনোই তোর জায়গাটা নিবো না। তুই একদমই স্বার্থপর না বোন একদমই না।(বলেই কাঁদতে কাঁদতে চলে আসে নীলা)
রাতে ঘুম ভাঙ্গে রানার।
ঘুম থাকে উঠে দেখে তার মাথাটা নীলার কোলে আর নীলা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
রানা কিছু না বলে ফ্রেশ হতে চলে যায়। রাতে সবার সাথে খাওয়া দাওয়া করে রুমে চলে আসে রানা আর রানার পিছে পিছে নীলাও।
রানা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরে। নীলা তার কাছে বসে রানার মাথাটা টেনে নেয় নিজের কোলে…
> রানা! তুই না আমায় ভালোবাসতি! এখন কি একটু ভালোবাসিস না আমায়! এখন কি আর একটুও জায়গা নেই আমার জন্য তোর মনে?(নীলা রানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে)
রানা কোনো কথাই বলে না। আসলে কি বলবে সে তার ঠিক জানা নেই।
> চিন্তা করিস না নিলীমার জায়গাটা নিবো না। কিন্তু একটু ভালোবাসার সুযোগ দে আমায়। অনেক ভালোবাসি তোকে। এই চারটা বছর অনেক কেঁদেছি জানিস। যতই দূরে থাকি কিন্তু তোকে কখনোই মন থেকে সড়াতে পারিনি। জানি না কেন কিন্তু তোর কথা ভাবতে ভালো লাগতো । যদিও জানতাম তুকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব না তবুও মন চাইতো তোকে নিয়ে সপ্ন সাঁজাতে। একটি সুযোগ দিবি আমায় বল!(নীলা)
রানা কিছুই বলতে পারে না। সে এখন নিশ্চুপ। এখন ভালোবাসতে তার ভয় লাগে।
চার বছর আগে যাকে ভালোবাসতো সে হঠাৎই তার জীবন থেকে হাড়িয়ে গেলো তারপর যার সাথে বিয়ে হলো সেও কিছু দিনেই হারিয়ে গেলো। নিয়তির এই নির্মম পরিহাশে সে আজ ভীত।
এভাবেই চলতে থাকে কিছুদিন। তারপর আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়।
নীলাকে মেনে নিকে একটু কষ্ট হলেও সে শেষ পর্যন্ত হেড়ে যায় নীলার ভালোবাসার কাছে। নতুন করে আবার শুরু করে জীবন।..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *